জন্মদিনে মৃত্যু নিয়ে ভাবছেন তসলিমা

প্রকাশিত: ২:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২০

জন্মদিনে মৃত্যু নিয়ে ভাবছেন তসলিমা

নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন আজ। দিনের প্রথম প্রহর থেকে শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসায় ভাসছেন তিনি। সে কথা জানিয়েছে বললেন, ‘আমি এক ভালোবাসার সামনেই মাথা নোয়াই।’ দিনটিতে আরও ভাবছেন মৃত্যু নিয়ে।

সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জন্মদিন নিয়ে নিজের অনুভূতি জানালেন তিনি। সেখানে উঠে আসে জীবন নিয়ে তসলিমার উপলব্ধির খানিকটা।

তসলিমা লেখেন, “জন্মদিন টন্মদিন আমার পালন করতে ইচ্ছে করে না। হিসেব করে দেখলাম আমার এখন যে বয়স, সে বয়সে আমার মা মারা গিয়েছিলেন। এই বয়সে পৌঁছানোর আগে বুঝিনি, এখন বুঝি যে মা খুব অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। জন্মদিন আসা মানে কবরের দিকে আরও একটি বছর এগিয়ে যাওয়া। আমি তো মৃতদেহ দান করেছি হাসপাতালে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার কাজে। সুতরাং আমার মৃতদেহ কবরে যাবে না, চিতায় উঠবে না, জলে ভাসবে না, কফিনে ঢুকবে না, আমার মৃতদেহ শুয়ে থাকবে হাসপাতালের শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষে, অথবা ল্যাবে। এর চেয়ে ভালো সৎকার আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু মৃত্যুর কথা আমি ভাবতে চাই না। যেদিন চলে যেতে হবে, সেদিন চলে যাবো। কিন্তু শেষদিন পর্যন্ত যেন ভাবতে পারি, বলতে পারি, লিখতে পারি। যেন রুখে দাঁড়াতে পারি। সব নিষেধাজ্ঞাকে যেন উড়িয়ে দিতে পারি। শেষদিন পর্যন্ত। ”

আরও বলেন, “আজ কত মানুষ যে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠাচ্ছে আমাকে! দেখে মনে হয় এতকাল আদর্শের জন্য সংগ্রাম করে শুধু কি নির্বাসন, ফতোয়া, প্রত্যাখ্যান, নিষেধাজ্ঞা, অবজ্ঞা, উপেক্ষা, ঘৃণাই জুটেছে? ভালোবাসাও তো পেয়েছি অনেক। আমি এক ভালোবাসার সামনেই মাথা নোয়াই।”

১৯৬২ সালের ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে তসলিমা নাসরিনের জন্য। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও চিকিৎসক। তার লেখালেখিতে বরাবরই রয়েছে নারীবাদী ও ধর্মীয় সমালোচনামূলক ভাষ্য। এ কারণে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। যার জের ধরে বিক্ষোভের মুখে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেটেছে নির্বাসন জীবনের অনেকটা সময়। বর্তমানে ভারতে আছেন তিনি।

তসলিমা নাসরিন ১৯৭৬ সালে ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে এসএসসি ও ১৯৭৮ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে এমবিবিএস শেষ করেন। এরপর সরকারি গ্রামীণ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

তেরো বছর বয়স থেকে তসলিমা কবিতা লেখা শুরু করেন। কলেজে পড়ার সময় সাহিত্য পত্রিকা ‘সেঁজুতি’ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ১৯৭৫ সাল থেকে পত্রিকায় তসলিমার কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৮৬ সালে ‘শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা’ প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে— কবিতা: নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে, আমার কিছু যায় আসে না, অতলে অন্তরীণ, বালিকার গোল্লাছুট, আয় কষ্ট ঝেঁপে জীবন দেবো মেপে, নির্বাসিত নারীর কবিতা, খালি খালি লাগে ও বন্দিনী; প্রবন্ধ: নির্বাচিত কলাম, যাবো না কেন? যাব, নষ্ট মেয়ের নষ্ট গল্প, নারীর কোন দেশ নেই, নিষিদ্ধ ও তসলিমা নাসরিনের গদ্য পদ্য; উপন্যাস: অপরপক্ষ, শোধ, নিমন্ত্রণ, ফেরা, লজ্জা, ভ্রমর কইও গিয়া, ফরাসি প্রেমিক, শরম; ছোট গল্প: দুঃখবতী মেয়ে ও মিনু; আত্মজীবনী: আমার মেয়েবেলা, উতাল হাওয়া, ক (পশ্চিমবঙ্গে দ্বিখণ্ডিত নামে প্রকাশিত), সেই সব অন্ধকার ও নির্বাসন।

তসলিমা নাসরিন দেশ-বিদেশে কিছু পুরস্কার পেয়েছেন— বাংলাদেশের নাট্যসভা পুরস্কার (১৯৯২), ভারতের আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯২ ও ২০০০). ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের শাখারভ পুরস্কার, ফ্রান্স সরকারের মানবাধিকার পুরস্কার, ফ্রান্সের এডিক্ট অব নান্তেস পুরস্কার, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল পেনের কার্ট টুকোলস্কি পুরস্কার, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচের হেলম্যান-হ্যামেট গ্রান্ট সম্মাননা এবং নরওয়েভিত্তিক হিউম্যান-এটিস্ক ফরবান্ডের মানবতাবাদী পুরস্কার (১৯৯৪)।