বন্যা ও করোনায় তাঁতশিল্পে ক্ষতি ২৫০ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ১০:৩৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০

বন্যা ও করোনায় তাঁতশিল্পে ক্ষতি ২৫০ কোটি টাকা

করোনাভাইরাস আর সাম্প্রতিক বন্যায় চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। ইতোমধ্যেই এ শিল্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা। তবে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দেয়া তাঁত বোর্ডের ক্ষুদ্র ঋণ তাঁতিদের ভাগ্য উন্নয়নে তেমন কোনো প্রভাব ফেলছে না। এ শিল্প রক্ষায় সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের দাবি জানান তাঁত সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের দুটি বেসিক সেন্টার রয়েছে। জেলার ঘাটাইল, মধুপুর, ধনবাড়ী, গোপালপুর, কালিহাতী ও ভূঞাপুর উপজেলার জন্য কালিহাতীর বল্লায় একটি আর দেলদুয়ার, বাসাইল, মির্জাপুর, নাগরপুর, সখীপুরসহ সদর উপজেলার জন্য বাজিতপুরে রয়েছে একটি বেসিক সেন্টার। বাজিতপুর ও বল্লা এ দুটি বেসিক সেন্টারের ৪৯টি প্রাথমিক তাঁতি সমিতি আর ৪টি মাধ্যমিক তাঁতি সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির চার হাজার ৩৯১টি তাঁত ফ্যাক্টরি মালিকের ২৭ হাজার ৯৩১টি তাঁত চালু বা সচল এবং দুই হাজার ৬৭৩টি তাঁত আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারি নির্দেশনায় কল-কারখানা-ফ্যাক্টরি বন্ধ ঘোষণা করায় চালু তাঁত ফ্যাক্টরিগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জেলার তাঁতশিল্পে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৮৭ লাখ ৫৬ হাজার ৪০০ টাকা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে থাকে।
করোনা মহামারির সঙ্গে বন্যার করাল থাবা জেলার এই তাঁতশিল্পকে চরম অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলেছে। করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ফ্যাক্টরিতে তাঁত মালিকদের বিনিয়োগ বিনষ্ট হচ্ছিল। এর সঙ্গে বন্যার পানি এসে ফ্যাক্টরিতে চালু তাঁত, তাঁতে থাকা সুতার ভিম, কাপড় ও সরঞ্জামাদি প্রায় সবই বিনষ্ট হয়েছে। এর ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁতশিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাজিতপুর বেসিক সেন্টার সূত্রে জানা যায়, এ সেন্টারের ৩২টি প্রাথমিক তাঁতি সমিতি ও তিনটি মাধ্যমিক সমিতির দুই হাজার ২৬৭ তাঁত মালিকের মোট ১২ হাজার ৪২৯টি তাঁত রয়েছে। এরমধ্যে দুই হাজার ৬৭৩টি তাঁত আগে থেকেই বন্ধ এবং ৯ হাজার ৭৫৬টি তাঁত চালু ছিল। এ বেসিক সেন্টারের তাঁতগুলোতে মিহি সুতার ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি হয়। হিসাব অনুযায়ী, করোনা মহামারির কারণে সরকারি নির্দেশনা মেনে বন্ধ রাখা প্রতি তাঁতে ৮০০ টাকা হারে প্রতিদিন গড়ে ৭৮ লাখ ৪ হাজার ৮০০ টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
কালিহাতী উপজেলার বল্লা বেসিক সেন্টারের তথ্য মতে, এ সেন্টারের ১৭টি প্রাথমিক তাঁতি সমিতি ও একটি মাধ্যমিক তাঁতি সমিতির অধীনে দুই হাজার ১২৪টি তাঁত ফ্যাক্টরি মালিকের ১৮ হাজার ১৭৫টি তাঁত রয়েছে। এ বেসিক সেন্টারের তাঁতগুলোতে অপেক্ষাকৃত মোটা সুতার শাড়ি উৎপাদিত হয়ে থাকে। বেসিক সেন্টারের হিসাব মতে, গত ২৬ মার্চ থেকে করোনার কারণে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় প্রতিটি তাঁতে দৈনিক ন্যূনতম ৬০০ টাকা হারে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৯ লাখ ৫ হাজার টাকা করে ক্ষতি হচ্ছে। দুটি বেসিক সেন্টারের অধীনে তাঁত ফ্যাক্টরিগুলো সে হিসেবে করোনার কারণে বন্ধ থাকায় প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৮৭ লাখ ৯ হাজার ৮০০ টাকা করে ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
গত ২৬ মার্চ থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত করোনায় টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে ২৫৬ কোটি ৩২ লাখ ৪২ হাজার ৬০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে নয়া দুর্যোগ হিসেবে সাম্প্রতিক বন্যা তাঁতশিল্পে হানা দিয়েছে। বন্যা তাঁতশিল্পের তাঁত, কাপড়, তানা ও সরঞ্জামাদীসহ সবকিছু ভাসিয়ে দিয়েছে। প্রায় দেড় মাস পানি থাকায় তাঁতশিল্পের কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের তাঁত মালিক, শ্রমিক, বেসিক সেন্টারের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা মহামারির সাথে বন্যার দুর্যোগ যোগ হয়ে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। শাড়ি ব্যবসার জন্য পয়লা বৈশাখ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও দুর্গাপূজা প্রধান মৌসুম। পহেলা বৈশাখে কোনো শাড়ি বিক্রি হয়নি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জন্য নতুন শাড়ি বানানো হয়নি।
টাঙ্গাইল শাড়ির রাজধানী পাথরাইলের শাড়ি প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী নীলকমল বসাক বলেন, করোনা ও বন্যা তাঁত শিল্পের মহা ক্ষতি করেছে। সরকারি প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি তাঁত শাড়ির বাজার তৈরিতেও সরকারের ভূমিকা দরকার।
টাঙ্গাইল জেলা তাঁতি লীগের সহ-সভাপতি কালাচাঁদ বসাক বলেন, করোনা মহামারি ও বন্যায় ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপাদন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ শিল্প আদৌ থাকবে কিনা সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সুদমুক্ত ঋণ ও সরকারি প্রণোদনা না পেলে তাঁতিরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং এর মালিক রঘুনাথ বসাক বলেন, করোনা মহামারি ও বন্যার ভয়াবহ দুর্যোগে জেলার তাঁত শিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সুদমুক্ত ঋণ ও প্রণোদনার পাশাপাশি সরকারের কাছে পাঁচদফা সুপারিশনামা দিয়েছি। সেটি বাস্তবায়িত না হলে এ শিল্পের চরম ক্ষতি হবে।
কালিহাতী বল্লা বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ইমরানুল হক বলেন, এ অঞ্চলের তাঁতিরা সাধারণত তুলনামূলক মোটা সুতায় তৈরি শাড়ি উৎপাদন করে থাকে। করোনার সাথে বন্যা যোগ হয়ে এ শিল্পে মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করেছে। ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অপরদিকে প্রতিটি তাঁতি পরিবারে অর্থাভাব দেখা দিয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক তাঁতিদের ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা হলেও তা এই মুহূর্তে উপকারে আসছে না। তাই তাঁতিদের প্রণোদনা দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসনে তালিকা পাঠানো হয়েছে।
টাঙ্গাইল সদরের বাজিতপুর বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার রবিউল ইসলাম জানান, তারা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক তাঁতিদের মাত্র ৫ শতাংম সার্ভিস চার্জে ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছেন। সরকারি নির্দেশনার বাইরে তাদের কাজ করার সুযোগ নেই। শাড়ি উৎপাদন ও বাজারজাত করণ কিংবা নতুন বাজার সৃষ্টিতে তাঁতিদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। করোনা ও বন্যায় তাঁতশিল্পকে ধসের মুখে ফেলেছে। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারলেও করোনা পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ শিল্প মহাসংকটে পড়বে।