‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বাংলাদেশের প্রতীক: গাস্তঁ রোবের্জ

প্রকাশিত: ১২:৩৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২০

‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বাংলাদেশের প্রতীক: গাস্তঁ রোবের্জ

সিনেমা পণ্ডিত ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ কলকাতায় মারা গেছেন বুধবার সকালে। ২০০৭ সালে ‘ওয়ার্কশপ অন মুভিজ টুডে’ শিরোনামের কর্মশালা উপলক্ষে ঢাকা আসেন তিনি। ওই সময় তার সাক্ষাৎকার নেন মাহবুব মোর্শেদ। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি হুবহু প্রকাশ করা হলো-

ফাদার গাস্তঁ রোবের্জের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ মে। তিনি বিএ ডিগ্রি নেন ১৯৬৫ সালে। যোগ দেন সোসাইটি অফ জেসাস-এ (জেসুইট ফাদারস)। তার অনুরোধেই তাকে ভারতে পাঠানো হয় ১৯৬১ সালে। তখন থেকেই প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি কলকাতায় বাস করছেন। ১৯৬৯-৭০ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে থিয়েটার আর্টসে (ফিল্ম) এমএ ডিগ্রি নেন। ১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায়ের সহযোগিতায় কলকাতায় চিত্রবাণী নামে একটি কমিউনিকেশন সেন্টার স্থাপন করেন। ১৯৮৬ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এডুকেশনাল মিডিয়া রিসার্চ সেন্টার চালু করেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে তিনি ফিল্ম বিষয়ক শিক্ষাদানের সঙ্গে জড়িত। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি ফিল্ম বিষয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। তার বইগুলোর মধ্যে চিত্রবাণী, সিনেমার কথা, নতুন সিনেমার সন্ধানে, সংযোগ সিনেমা উন্নয়ন, আইজেনস্টাইনস আইভান দি টেরিবল : অ্যান অ্যানালাইসিস, অ্যানাদার সিনেমা ফর অ্যানাদার সোসাইটি, দি সাবজেক্ট অফ সিনেমা, সাইবারবাণী ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলা কীভাবে শিখলেন?

আমি যখন কলকাতায় আছি তখন বাংলা শিখবো না! আমি তো কলকাতায় অনেক দিন ধরে আছি, এটা জানো? ১৯৬১ থেকে। অর্থাৎ ৪৫ বছর। প্রথম দিন থেকে আমি বাংলা শিখতে শুরু করেছি। আমাকে এখানে বলা হয়েছে আরও ভালো বলা উচিত। আমি সিনেমা সম্পর্কে কথা বলতে অনেক দিন ধরে ঢাকা আসি। রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির আমন্ত্রণে আমি একবার গ্যোটে ইনস্টিটিউটে এসেছিলাম। তখন একজন বললো, আরও ভালো বাংলা বলা উচিত। আমি মনে করি কথাটা ঠিকই বলেছে। কলকাতায় শতকে ৪৯ মানুষ বাংলাভাষী। প্রায় অর্ধেক মানুষ বাংলায় কথা বলে। বাকিরা হয় হিন্দি নয় ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। বাকি জায়গায় পুরোপুরি বাংলা। সাঁওতালি আছে, অন্য ভাষা আছে। বেশির ভাগই বাঙালি কিন্তু কলকাতা আলাদা। দেখা যায় যখন ঢাকায় আসি তখন এখানে সবাই বাংলায় কথা বলে।

সাধারণত আমাদের এখানকার মানুষ ওয়েস্টের জন্য আকুল হয়ে থাকে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে দেখা গেল উল্টো ঘটনা – আপনি ওয়েস্ট থেকে এসে বাংলায় থাকতে শুরু করলেন। আপনি কেন বাংলায় থেকে গেলেন? কী এমন আকর্ষণ বাংলার।

খুবই ভালো প্রশ্ন। আশা করি একটা ভালো উত্তরও আছে। আমি যখন একেবারে পাঁচ বছর বয়সী তখন আমার একজন মামা ইন্ডিয়া এসেছিলেন। তিনি কানাডিয়ান আর্মিতে ছিলেন। তিনি আসলে সিলনে ছিলেন। তখনকার সিলন আজকার শ্রীলঙ্কা। সিলন তখন ইন্ডিয়ার একটি অংশ ছিল। ইন্ডিয়াতে ছিলেন তিনি। আমি মাঝে মধ্যে মামার কাছে যেতাম। তিনি আমাকে ইন্ডিয়ার গল্প বলেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘ভারত না ভারতীয়। দেশ না মানুষ।’ এই ব্যাপারটা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। যখন কলকাতা পৌঁছলাম তখন তার কথা মনে হয়েছিল। তিনি যেন একটা বীজ রোপণ করেছিলেন আমার প্রাণে। দু নম্বর ব্যাপার হলো, আমি যখন কানাডা থেকে কলকাতা আসি। আমার বড় ফাদার বলেছিলেন, তুমি যাও নৌকা করে। জাহাজে। আস্তে আস্তে যাবে। মনে শান্তি পাবে। আমি মন্ট্রিয়েল থেকে নিউইয়র্ক গেলাম এক রাত্রির জন্য। আমার জাহাজটা নিউইয়র্ক থেকে ছেড়ে দিয়েছে। যেতে যেতে শুনলাম, যেখানে যাচ্ছি সেই কলকাতা থেকে একটা ট্রিলজি দেখানো হয়। সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজি। এক রাতে আমি অপু ট্রিলজি দেখলাম। অসাধারণ! কী সুন্দর, কী মানুষ। যখন কলকাতা পৌঁছলাম তখন আমার মনে হলো, এই তো সর্বজয়া, হরিহর, দুর্গা, অপু। ফলে সম্পর্ক হয়েছে প্রাণের সম্পর্ক। আমার মামা যে বলেছিলেন তা কুড়ি বছর পরের ঘটনা ছিল এটা। আমি তো ইন্ডিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, কলকাতা সম্পর্কে কিছু জানতাম না। কিন্তু এটা ছিল হার্ট অফ বেঙ্গলের দিকে আমার যাত্রার শুরু।

মানুষের কথা তো শুনলাম। এখানকার ইন্টেলেকচুয়ালিটি আপনাকে কি আকৃষ্ট করেছে? ইন্ডিয়ান চিন্তা বা বাংলার চিন্তা আপনাকে আকৃষ্ট করেছে কি? সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আপনার সখ্যের কথা আমরা জানি। তার বাইরে ইন্ডিয়ান থট প্রসেস, নন্দনতত্ত্ব আপনাকে আকৃষ্ট করেছে কি-না।

আমি আস্তে আস্তে আকৃষ্ট হয়েছি। সর্বপ্রথম আমি ইয়োগা শিখলাম একজন ইন্ডিয়ান সাধুর কাছ থেকে। তারপর মির্চা এলিয়াদের বই থেকে ইয়োগা সম্পর্কে পড়লাম। তারপর এলো রবীন্দ্রনাথ। গীতাঞ্জলি। আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম ডায়ালগ উইথ টেগোর। কাল্পনিক একটা ডায়ালগ। যেখানে টেগোর আমাকে বলছেন, তোমরা ওয়েস্টের লোকেরা দমন করতে চাও পৃথিবী ও জীবন। কিন্তু আমরা এনজয় করতে চাই। গভীরভাবে এনজয় করতে চাই। উই ওয়ান্ট টু লিভ ফুলি। এটা ছিল তখন আমার মতো।

আমি রোমে আমার বড় ফাদারকে বলেছিলাম, আমি সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি আমাকে কলকাতায় যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি শিখতে চেয়েছিলাম এখানকার সংস্কৃতি ও ধর্ম। বিশেষভাবে ধর্ম শিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময়ক্রমে আমি মুসলিম ধর্মের চেয়ে হিন্দু ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম। নিশ্চয় আমাকে আমার সংস্কৃতি বা ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে আমি উত্তর দেবো। কিন্তু প্রচার করা আমার প্রধান উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা গ্রহণ করা। সময়ক্রমে আমি যখন ফাদার হয়েছি তখন আমার বড় ফাদার বললেন, তুমি কমিউনিকেশন লাইনে কাজ করো। আসলে আমি শুরু থেকেই কমিউনিকেশন করছিলাম। ডায়ালগ করছিলাম। ডায়ালগ তো এক ধরনের কমিউনিকেশন। তখন আমি আবার ফিরে গিয়েছি ইউনাইটেড স্টেটসে। কারণ তখন ইন্ডিয়ান তিন বছর ছাড়া সিনেমা সম্পর্কে কোর্স ছিল না। ওখানে গিয়ে আমি এক বছরের মধ্যে কোর্স করেছি। এর আগে অনেক পড়েছি। এ কারণে এক বছরের মধ্যে কোর্স করতে সুবিধা হয়েছে।

আমাদের ধর্মে প্রচার একটা বড় ইমপালস। কিন্তু আমি বেছে নিয়েছি কমিউনিকেশন। আমি জানি, শুধু প্রচার করলে কমিউনিকেশন হয় না। প্রথমে শুনতে হয়, শিখতে হয়। নইলে ডায়ালগ হয় না।

কলকাতায় আপনার কাজের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

শুরু থেকে আমার উদ্দেশ্য ছিল মিডিয়া এডুকেশন। যেহেতু চলচ্চিত্র একটা শক্তিশালী ও জনপ্রিয় আর্ট মাধ্যম সেহেতু শুরুতে আমার উদ্দেশ্য ছিল সিনেমার মাধ্যমে সব মিডিয়ার কাছে পৌঁছানো। এটা শুধু সিনেমা নয়, সিনেমার মাধ্যমে মিডিয়া, মিডিয়ার মাধ্যমে সমাজের কাছে পৌঁছানো। সমাজ হলো আসল কথা। কীভাবে সমাজের মধ্যে একটি অর্থপূর্ণ জীবন তৈরি করা যায়। সিনেমা ইজ এ গুড এন্ট্রি। সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। প্রথমে শুরু করেছি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। তারপর বুঝলাম একটা কাজ করার জন্য এমন একটা প্রতিষ্ঠান দরকার যে শুধু সেই কাজ করে। সেই প্রতিষ্ঠানের নাম হলো ‘চিত্রবাণী’। এটা আমরা শুরু করেছি ১৯৭০ সালের দিকে। এমন নয় যে এক বছরেই এটি গড়ে উঠেছে বরং ধীরে ধীরে এটি তৈরি হয়েছে। আমার সৌভাগ্য যে শুরু থেকে সত্যজিৎ রায় এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন এর ফাউন্ডার মেম্বারদের একজন। তিনি আলাপ-আলোচনা করে আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। যদিও তিনি ব্যস্ততার কারণে ওখানে খুব বেশি যেতেন না। অন্য একজন ফাউন্ডার ছিলেন কবিতা সরকার। এটা ছিল তার পেন নেম। তিনি ছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের ভাইয়ের বউ। তিনিও খুব সাহায্য করেছেন।

সত্যজিতের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে হলো?

পরিচয় হয়েছে অপু ট্রিলজির মাধ্যমে।

ব্যক্তিগত পরিচয়?

আমি কলকাতায় এসে অন্য ফাদার ও বন্ধুদের সঙ্গে অপু ট্রিলজি নিয়ে আলাপ করেছি। তখন তারা আমাকে বললেন, আপনি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করেন না কেন? তিনি খুব ভালো মানুষ। আমি বলেছি, না। আমি যখন ওনার সব মুভি দেখিনি তখন ওনাকে গিয়ে কী বলবো? আপনার বয়স কতো? কতো সালে জন্ম, এইসব? এভাবে আমি আলোচনা করতে পারবো না। হলো কী, আমি যখন ১৯৭০ সালে এমএ করার পর ফিরে আসি তখন লন্ডনে যাই বন্ধু মারি সিটনের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি আমাকে একটা চিঠি দিলেন সত্যজিৎ রায়কে দেওয়ার জন্য। মারি সিটন প্রথম আইজেনস্টাইন সম্পর্কে বায়োগ্রাফি লিখেছেন। তিনি আমাকে বললেন, তুমি মানিকদার কাছে একটা চিঠি নিয়ে যাও। তখন আমাকে যেতে হলো। সেদিন থেকে পরিচয় কিন্তু আমি আরও বেশি অপেক্ষা করতাম। আমি ভাবতাম আরও যোগ্যতা অর্জন করে তার কাছে যাবো। কিন্তু তারপরও আমাদের সম্পর্ক অনেক ভালো হয়েছে। কোনো দিন অসুবিধা হয়নি।

সত্যজিতের সঙ্গে আপনার কাজের সম্পর্ক কীভাবে এগোলো?

আমাদের আলোচনার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট মেনু ছিল না। যা মনে ছিল তা-ই আলোচনা হতো। মাঝে মধ্যে চিত্রবাণীর কাজ। মাঝে মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটছে তা। আলাপে বিশেষ কিছু ছিল না। সাধারণ আলোচনায় যা ঘটে তাই। একবার তিনি বললেন, আমি একটা নতুন ছবি করেছি প্রতিদ্বন্দ্বী। চলুন দেখি। রিলিজ হওয়ার আগে তিনি দেখতে চান কেমন মুভি, সাউন্ড এসেছে। হলে আমরা শুধু দুজন। তিনি ছিলেন আমার সাত-আট ফিট দূরে। হঠাৎ একটা দৃশ্যে আমার মজা লেগেছে, তো আমি হাসলাম। সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম তার কোনো মজা ছিল না। আমার এতো লজ্জা হয়েছে! কিন্তু হাসি তো লুকানো যায় না।

ব্যক্তি সত্যজিতের কোন ব্যাপারটা আপনাকে আকৃষ্ট করেছে?

এ রকম অনেক কথা আছে। একটা কথা বলবো। আমি তার কাছে রবিবার যেতাম ৯টার সময়। আমি জানতাম তখন তিনি ফ্রি আছেন। কারণ এ সময় বেশি লোক বের হয় না। অসুবিধা হবে না। তিনি সব সময় প্রস্তুত। কিন্তু যখন শেষের দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন লাস্ট ট্রিলজি (গণশত্রু, শাখা-প্রশাখা, আগন্তুক) করার পর, সবাই বুঝতে পারলো তিনি আর বেশি দিন বাঁচবেন না। তখন আমার অভ্যাস মতো ৯টার সময় হসপিটালে গেলাম। তিনি ছিলেন ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটে। ডাক্তার ঢুকতে দেবেন কি-না এটা ভাবতে ভাবতে অনুমতি দিলেন। তার শরীর অসুস্থ, কিন্তু মন পরিষ্কার। আমি ঢুকতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছেন? ফিরে আসার সময় তিনি বাংলায় বললেন, খুব ভালো লাগলো। ওটা আমার সঙ্গে তার শেষ কথা। তিনি সব সময় ইংরেজিতে কথা বলতেন। খুবই ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন। কিন্তু যখনই কোনো ইমোশনাল ব্যাপার আসতো, তিনি বাংলায় বলতেন। এ কারণেই তার শেষ কথাটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। আমি কিছু বলিনি।

আপনার মধ্যে ক্রিশ্চিয়ান অ্যাপ্রোচের সঙ্গে সর্বসাম্প্রতিক দর্শনের একটা ঐক্য দেখতে পাই। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? এটা তো খুব কঠিন একটা কাজ।

কঠিন আছে। কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা সামাজিক স্বাধীনতা না পেতে পারি কিন্তু যদি ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন হয়ে যাই তবে সেটা সম্ভব। সমাজের ভেতরে স্বাধীনতা আনার জন্য স্বাধীন মানুষ দরকার। মনের স্বাধীনতা, প্রাণের স্বাধীনতা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। আমাকে হত্যা করতে পারে কিন্তু আমার স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে না।

আপনার কি মনে হয় ব্যক্তির স্বাধীনতা সার্বিক স্বাধীনতা আনতে পারে। রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও আমরা পড়েছি ব্যক্তির মুক্তির কথা। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, ব্যক্তির মুক্তি কি সামষ্টিক মুক্তি আনতে পারে?

এক সময় আমি এক সন্ন্যাসীকে ঠিক এই কথা বলেছিলাম। আমার যদি ঠিকঠাক মনে পড়ে তো তিনি বলেছিলেন, ইচ্ছা করতে হয়। আর এক রকম বিশ্বাস করতে হয়। এটা ধর্ম বিশ্বাস নয়, আস্থা বা নিশ্চয়তা তৈরি হতে হয়।

আপনার বইয়ের প্রসঙ্গে আসি। আপনি কি ইংরেজি ভাষায় লেখেন?

হ্যাঁ।

শুনেছি এগুলো কবি উৎপল কুমার বসু অনুবাদ করেছেন।

সবগুলো না। সিনেমার কথা বইটা তিনি অনুবাদ করেছিলেন। আরেকটা বই সংযোগ সিনেমা উন্নয়ন বইটা অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের একজন লোক। তার নাম কৃষ্ণপদ শাণ্ডিল্য। এখন তিনি আমার নতুন একটি বই অনুবাদের কাজ করছেন। আমার প্রথম বই ছিল চিত্রবাণী। প্রতিষ্ঠান চিত্রবাণী ও প্রথম বই চিত্রবাণী নামটা আমি নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ থেকে। আমি জানতাম সিনেমার বাংলা হিসেবে চিত্রবাণী শব্দটা তিনি বেছে নিয়েছিলেন। সেই চিত্রবাণী শব্দটা ৩৫ বছর পর এসে সাইবারবাণীতে পরিণত হয়েছে। আমার নতুন বই সাইবারবাণী।

এখন কী নিয়ে কাজ করছেন?

আরেকটা বইয়ের কাজ চলছে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে। বিভিন্ন সময়ে তার ওপর লেখা আমার প্রবন্ধগুলো সত্যজিৎ রায় : এসেজ ১৯৭০-২০০৫ নামে বের হবে দিল্লির মনোহার পাবলিকেশন থেকে। আরেকটা বইয়ের কাজ আমি করছি, নাম : প্যাডাগজি অফ দি মিডিয়া অবপ্রেসড। আমি এ নামটা নিয়েছি পাওলো ফ্রেরির একটা বইয়ের নাম থেকে। বইটার নাম প্যাডাগজি অফ দি অবপ্রেসড। এটা ল্যাটিন আমেরিকা থেকে এসেছিল। আমি এটা নতুন ধরনের একটা বই করছি। বইটি বিএ, বিএসসি ছাত্রদের কোর্সের জন্য উপযুক্ত হবে। এটা ২০টা মডিউলে বিভক্ত। মাঝে মধ্যে ফ্রাগমেন্ট থাকবে। ছোট ছোট পার্টে বিভক্ত থাকবে। প্রায় সময় লেখকরা নিউ মিডিয়া নিয়ে লেখে, কিন্তু পুরনোদের মতো বই-ই লেখে। আমি নতুন মিডিয়া নিয়ে নতুন আঙ্গিকে লিখছি এ বইটা।

আপনি তো বাংলাদেশে আর একবার এসেছেন।

নাহ। অন্তত ১০-১৫ বার।

বিভিন্ন সময়ে এসেছেন। দেখেছেন। আমরা খানিকটা হতাশ থাকি যে আমাদের এখানে সিনেমার প্রত্যাশিত বিকাশ হলো না। কেন?

একাত্তরের যীশু সিনেমাটা দেখেছো। আমার বইয়ে একটা লেখা আছে ছোট বোবা মেয়ে বাঁশি বাজাতে শিখেছে। সেই ছোট মেয়ে আমার চোখে বাংলাদেশের প্রতীক। ঠিক তেমন বেদের মেয়ে জোছনা বাংলাদেশের প্রতীক। বেদের মেয়ে জোছনা তিন পিতার কন্যা। তার তিনটা পরিচয় জন্মগত, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক। এটা কি ভালো মুভি নয়? আরেকটা মুভি আছে। যেটার কথা বইতে দিতে পারিনি। তারেক মাসুদের অন্তর্যাত্রা। আমি এটা খুবই পছন্দ করেছি। তারেককে বলেছিলাম, অন্তর্যাত্রার শেষ নেই।

আপনার পছন্দের মুভি কোনগুলো?

আমি পছন্দ করি চেঞ্জ। এখন যেটা নিয়ে ভাবছি সেটা পরে হয়তো চেঞ্জ হয়ে যাবে। তারপরও কিছু মুভি আছে। ব্যাটেলশিপ পটেমকিন, বাইসাইকেল থিফ, দি ডায়রি অফ এ কান্ট্রি প্রিস্ট। দি ডায়রি অফ এ কান্ট্রি প্রিস্ট রবার্ট ব্রেসোঁর মুভি। তিনি আমার খুবই পছন্দের ফিল্ম মেকার। সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজি ও শেষ পর্যায়ে করা ট্রিলজি।

সূত্র : দেশ রূপান্তর অনলাইন।